উন্নয়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগ

প্রিন্ট
  • মো. মতিয়ার রহমান : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, কৃষকের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনার কথা সরকার তুলে ধরেছে।
    পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ
    সরকারের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিগুলোর একটি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পরিবারের নারীপ্রধানের আর্থিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলা ও তিনটি সিটি করপোরেশনের ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারের নারীপ্রধানকে মাসিক ২,৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়।
  • পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১২ অক্টোবর ২০২৬ থেকে দেশব্যাপী পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়, যাতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে যোগ্য পরিবার শনাক্ত করা যায়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে
  • কৃষকের পাশে ‘কৃষক কার্ড’
  • কৃষি ও কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির প্রাক্‌-পাইলট কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। টাঙ্গাইলসহ ১০ জেলার ১১টি উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্বোধনী পর্যায়ে ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের ব্যাংক হিসাবে ২,৫০০ টাকা করে পাঠানোর কথা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
    সরকারের পরিকল্পনায় কৃষকদের কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা প্রদানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করতে একটি সমন্বিত ও যাচাইযোগ্য ডেটাবেজ তৈরির নির্দেশ দেন। ১ অক্টোবর ফেনী সফরেও তিনি কৃষক কার্ড বিতরণ করেন।
    কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
    বন্যা নিয়ন্ত্রণ, খাল খনন ও কৃষি অবকাঠামো
    পানি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে সরকার খাল ও নদী পুনঃখননের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, পাঁচ বছরে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন বা পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে।
    ১ অক্টোবর ফেনী সফরে প্রধানমন্ত্রী ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের পুনর্বাসন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। একই সফরে মুহুরী নদী খনন, খাল খনন এবং বাঁধ নির্মাণসংক্রান্ত কার্যক্রমও শুরু করা হয়।
    এসব প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষিজমিতে সেচের সুবিধা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা হ্রাস এবং বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষের সম্পদ সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
    পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ
    পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। ১৫ এপ্রিল সংসদে তিনি জানান, কর্মসূচির জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ চারা উৎপাদন করা হয়েছে।
    ১ অক্টোবর ফেনী সফরে তিনি বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ সফল হলে সবুজায়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে অবদান রাখতে পারে।
    স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
    স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী ৬ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় ধাপে ধাপে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিকল্পনার কথা জানান। পর্যায়ক্রমে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, নাগরিকদের জন্য ই-হেলথ কার্ড চালু, মাতৃ ও শিশুসেবা সম্প্রসারণ এবং চিকিৎসাব্যবস্থার মান উন্নয়নের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
    এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। পরিকল্পনাগুলোর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও সেবার মানের ওপর।
    শিক্ষা, দক্ষতা ও তরুণদের কর্মসংস্থান
    শিক্ষা আধুনিকীকরণ এবং তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিও সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। ১৫ এপ্রিল সংসদে প্রধানমন্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনা মূল্যে ইউনিফর্ম বিতরণের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানান। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
    শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কর্মমুখী দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
    আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা
    বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ১২ অক্টোবর কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, কারিগরি শিক্ষা এবং জলবায়ু অর্থায়নে সহযোগিতার বিষয় আলোচিত হয়।
    এ ছাড়া ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ ও জাপান সরকার প্রধানমন্ত্রীর ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরের ঘোষণা দেয়। সফরে বাণিজ্য, জাপানি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয় নিয়ে আলোচনার কথা জানানো হয়। সফরটি ঘোষণার সময় পর্যন্ত ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ছিল; তাই এর ফলাফল মূল্যায়নের জন্য পরবর্তী অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
    অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন: সামনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ
    ৩ অক্টোবর ঢাকায় ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং তরুণদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।
    সরকারের ঘোষিত উদ্যোগগুলো দেশের মানুষের কল্যাণে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো, প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব উন্নতি।
    প্রধানমন্ত্রী  তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম আট মাসে পরিবারভিত্তিক সামাজিক সহায়তা, কৃষক কার্ড, খাল ও নদী পুনঃখনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা আধুনিকীকরণে বিভিন্ন কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সামনে এসেছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা, কৃষির উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো শক্তিশালী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
    দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর স্বচ্ছ, সময়োপযোগী ও কার্যকর বাস্তবায়ন এবং অগ্রগতি সম্পর্কে জনগণকে নিয়মিত অবহিত করা। উদ্যোগগুলোর সুফল যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক, নিম্নআয়ের পরিবার, নারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।